প্রার্থনা কবিতার প্রশ্নের উত্তর

parthona-kobitar-question-answers

প্রার্থনা কবিতার প্রশ্নের উত্তর (দ্বাদশ শ্রেণির চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা) 

দ্বাদশ শ্রেণির উচ্চমাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার প্রদান করতে চলা শিক্ষার্থীদের জন্য FREENOTE.IN ওয়েবসাইটের পক্ষ থেকে প্রার্থনা কবিতার প্রশ্নের উত্তর (দ্বাদশ শ্রেণির চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা) প্রদান করা হলো। শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই প্রশ্নের উত্তরগুলির সহায়তা লাভ করতে পারবে।

প্রার্থনা কবিতার প্রশ্নের উত্তর (দ্বাদশ শ্রেণির চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা) :

 

১) ‘প্রার্থনা’ কবিতায় কবি কী প্রার্থনা করেছেন ? সেই প্রার্থনা কীভাবে পূরণ হতে পারে ? ২+৩=৫

উৎসঃ

বিশ্বকবি ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ রচিত ‘নৈবেদ্য’ কাব্যের  অন্তর্গত ৭২ নং কবিতা হল ‘প্রার্থনা’।

কবির প্রার্থনাঃ

আলোচ্যমান কবিতায় ঈশ্বরবিশ্বাসী কবিহৃদয় সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন-পরমেশ্বর যেন চেতনায় আঘাতের মাধ্যমে ভারতীয়দের চেতনার জড়ত্ব দূর করেন; জ্ঞানচর্চার সীমাবদ্ধতা, আচারসর্বস্বতা পরিহার করিয়ে ভারতীয়দের উন্নত জীবনাদর্শে উন্নীত করে উচ্চ বিবেকবোধ সমন্বিত স্বর্গরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করেন।

কবির প্রার্থনা পূরণের উপায়ঃ

অখন্ড ভারতীয়ত্বের চেতনা থেকে বর্তমান ভারতবর্ষ অনেকটাই দূরে সরে গেছে। ভারতের প্রাচীন গৌরব ছিল স্বর্গের মতোই শ্রেষ্ঠত্বের স্থানে অধিষ্ঠিত। আলোচ্যমান কবিতায় বিবৃত স্বর্গ মানে প্রচলিত কোনো অলৌকিক স্বর্গ নয়, এই মাটির পৃথিবীতে মানুষের মাঝেই বিরাজিত সেই স্বর্গ। উদার আদর্শ, উন্নত মানসিকতা, মুক্ত চিন্তাচেতনার প্রসার ও গণ্ডিবিহীন জ্ঞানচর্চার অবকাশ আছে যেখানে-সেটাই হল আলোচ্যমান কবিতার স্বর্গ। একদা ভারতীয়দের বিবিধ কর্মধারা ছড়িয়ে পড়ত দিকে দিকে, সেটাই ছিল স্বর্গ। সেই স্বর্গে উন্নীত হতে হবে ভারতীয়দের। কবির প্রার্থনা পরমেশ্বরের কাছে-তিনি যেন ভারতীয়দের চেতনার জগতে আঘাত হেনে, তাদের জড়ত্বের অবসান ঘটান। তবেই ভারতীয়রা আবার তাদের হৃতগৌরব ফিরে পাবে। এভাবেই পরমেশ্বর কবির প্রার্থনা পূরণ করতে পারেন।

 

 

২) “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির, জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী বসুধারে রাখে নাই খন্ড ক্ষুদ্র করি,”- এটি কার লেখা, কোন্ কবিতার অংশ এবং মূল কাব্যগ্রন্থের নাম কী? চরণগুলির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।

রচনাকার এবং মূলগ্রন্থঃ

প্রশ্নোধৃত চরণগুলি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা আমাদের পাঠ্য ‘প্রার্থনা’ কবিতার অংশ। ‘প্রার্থনা’ কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের ‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ৭২ সংখ্যক কবিতা।

চরণগুলির তাৎপর্যঃ

আলোচ্য কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বিশ্বপিতার কাছে এমন এক স্বদেশভূমি প্রার্থনা করেছেন, যেখানে দেশবাসীর স্বাধীন চেতনা এবং জীবনবোধ মর্যাদার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। আলোচ্য কবিতায় রবীন্দ্রনাথ এমন এক ভারতবর্ষের কথা ভেবেছেন, যেখানে মানুষের মন সমস্ত রকমের আশঙ্কা থেকে মুক্ত হয়ে সসম্মানে মাথা উঁচু করে আত্ম-পরিচয় খুঁজে নিতে পারবে।

আসলে আজীবন রবীন্দ্রনাথ পূর্ণতার প্রত্যাশী। কবি জানেন নতুন ভারতবর্ষের উদ্বোধনের জন্য প্রয়োজন পরিপূর্ণ মনুষ্যত্ব। দীর্ঘ দিনের পরাধীনতায় ভারতবাসী হারিয়ে ফেলেছে আত্মবিশ্বাস। আত্মবিস্মৃত দেশবাসীকে তাই তিনি স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন ভারতের আধ্যাত্মিক আদর্শের সুমহান ঐতিহ্য। তিনি এমন এক ভারতবর্ষ কামনা করেছেন যেখানে দেশবাসী ভয়শূন্য হৃদয়ে উন্নত মস্তকে জ্ঞানচর্চার উন্মুক্ত ক্ষেত্রে বিচরণ করতে পারবে। কবি জানেন এই বিরাট পৃথিবীতে কর্মের বিচিত্র সম্ভাবনাকে ক্ষুদ্র গৃহসীমায় আবদ্ধ করলে মানুষের প্রাপ্তির ভাণ্ডার সংকুচিত হয়ে যায়। ব্যক্তিসত্তা হোক বা জাতিসত্তা, খণ্ডিত ক্ষুদ্রতার মধ্যে তার পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। তাই কবি এমন এক স্বদেশের স্বপ্ন দেখেছেন যেখানে ব্যক্তি-বিশেষের মানসিক সংকীর্ণতার গৃহপ্রাচীর দ্বারা এই বিশ্বভুবন দ্বিখন্ডিত হবে না। বরং সেই দেশের নাগরিকদের মুক্ত চিন্তা ও সম্প্রীতিবোধের দ্বারা – সমগ্র বিশ্বই ‘এক’ রূপে প্রতিভাত হবে। অর্থাৎ ভারতের আধ্যাত্মিক আদর্শের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রেখেই কবি প্রশ্নোধৃত চরণগুলি রচনা করেছেন।

 

৩) ‘প্রার্থনা’ কবিতাটির মূল বক্তব্যবিষয় নিজের ভাষায় লেখো। ৫

উৎসঃ

বিশ্বকবি ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ রচিত ‘নৈবেদ্য’ কাব্যের  অন্তর্গত ৭২ নং কবিতা হল ‘প্রার্থনা’।

কবিতাটির মূল বক্তব্য বিষয়ঃ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘প্রার্থনা’ কবিতায় উল্লেখিত ভারতের প্রাচীন সহজসরল সত্তাকে কবি বর্তমানে কোথাও খুঁজে পাচ্ছেন না। সর্বগ্রাসী অধঃপতন যেন ভারতকে গ্রাস করেছে। কবি অনুভব করেন ভারতীয়দের মর্মলোক আজ আচ্ছন্ন হয়েছে গ্লানিতে। অল্পেই তাদের শির হচ্ছে অবনত আর জ্ঞান এখানে বদ্ধ হয়ে পড়ছে সংকীর্ণতার জটাজালে। কবি চান ভারতীয়রা চিত্তকে ভয়শূন্য করে, উন্নত শিরে, মুক্ত জ্ঞানের অধিকারী হোক। গৃহের সীমাবদ্ধ গণ্ডিকে অতিক্রম করে মুক্ত পৃথিবীতে এগিয়ে যেতে হবে দেশবাসীকে, নানা কাজের মধ্যে কর্মমুখর থেকে নিজেকে করতে হবে সার্থক। সংকীর্ণ আচারের মলিনতাকে দূর করতে হবে আর ভারতীয়দের জাগ্রত হতে হবে আপন পৌরুষত্বে। ঈশ্বরবিশ্বাসী কবির মতে সকল কর্ম-চিন্তা-আনন্দের নেতা হলেন পরমেশ্বর। তিনিই নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে ভারতীয়দের প্রাচীন গৌরবে প্রতিষ্ঠিত করবেন। অর্থাৎ নানা আঘাতের মধ্য দিয়েই ভারতীয়দের মানসিক অচলাবস্থা দূরীভূত হবে এবং তারা পূর্ব গৌরবময় পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন।

 

 

৪) “জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর / আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী, বসুধারে রাখে নাই খন্ড ক্ষুদ্র করি,” – মুক্ত জ্ঞান কী? কীসের দ্বারা বসুধা খন্ড ক্ষুদ্র হয়ে যায়?

উৎসঃ

বিশ্বকবি ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ রচিত ‘নৈবেদ্য’ কাব্যের  অন্তর্গত ৭২ নং কবিতা হল ‘প্রার্থনা’।

মুক্তজ্ঞানের পরিচয়ঃ

উপনিষদে আস্থাশীল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, বিশুদ্ধ জ্ঞানই পরম ব্রহ্ম। মুক্ত জ্ঞান সর্বদাই সকল সংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে পূর্ণ জীবনবোধের সন্ধান দেয়। সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার আমাদের সত্যধর্ম থেকে দূরে সরে থাকা চেতনাকে সংকীর্ণতায় খন্ডিত করে দেয়। কিন্তু মানবহিতৈষী রবীন্দ্রনাথ পূর্ণতার প্রার্থী, তিনি চেয়েছেন সমস্ত সংকীর্ণতার অপসারণ ঘটে মানুষের মনে জাগবে জ্ঞানের আলো, নবচেতনার আলোয় সে বুঝতে পারবে আত্মপ্রতিষ্ঠার একটাই পন্থা, সেটা হল সৎ কর্ম। এই কর্মের দ্বারাই সে তার গৃহসীমার আগল ঘুচিয়ে দাঁড়াবে বিশ্বের আঙিনায়। কবির মতে, নিজের হৃদয়ের উদারতা এবং বিশ্বদেবতার সঙ্গে এক হয়ে যাওয়ার এই বোধ জাগরিত হবে মুক্ত জ্ঞানের মাধ্যমেই।

বসুধা যেভাবে খণ্ডিত হয়ঃ

কবিগুরু অত্যন্ত হতাশার সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেছেন, আমরা কীভাবে ভৌগোলিক সীমারেখা এবং নিজেদের মনের সংকীর্ণ সংস্কার দিয়ে এই বৃহৎ পৃথিবীর অখণ্ডতাকে বিনষ্ট করে তাকে দ্বিখণ্ডিত করি। কবি জানেন এই বিরাট বসুন্ধরায় যে অনন্ত সম্ভাবনা রয়েছে তাকে ক্ষুদ্র গৃহসীমায় আবদ্ধ করলে মানবজাতিরই ক্ষতি, কারণ এতে তার প্রাপ্তির পরিসর সংকুচিত হয়ে যায় এবং তার ব্যক্তিসত্তার পূর্ণ বিকাশও হয় না। কাজেই কবি সাম্প্রদায়িক, ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা ভৌগোলিক বিভাজনমুক্ত এমন এক দেশ তথা পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছেন যেখানে সমস্ত সংস্কারের বেড়াজাল ছিন্ন হয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে কেবল মানবধর্ম। মানবজাতির সার্বিক বিকাশের মাধ্যমে কবির স্বদেশ তথা পৃথিবীর কল্যাণসাধন হবে।

 

 

৫) “যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে উচ্ছ্বসিয়া উঠে, যেথা নির্ধারিত স্রোতে দেশে দেশে দিশে দিশে কর্মধারা ধায় অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়” – কবির বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝিয়ে দাও।

উৎসঃ

বিশ্বকবি ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ রচিত ‘নৈবেদ্য’ কাব্যের  অন্তর্গত ৭২ নং কবিতা হল ‘প্রার্থনা’।

কবির বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থঃ

উদ্ধৃত কবিতাংশটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ৭২ সংখ্যক কবিতা তথা আমাদের পাঠ্য ‘প্রার্থনা’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোচ্য কবিতায় কবি বিশ্বপিতার চরণে আত্মনিবেদন করে উন্নত স্বদেশ নির্মাণের প্রার্থনা করেছেন। প্রশ্নোধৃত চরণগুলিতে কবির আকাঙ্ক্ষিত স্বদেশের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য ধরা পড়েছে।

কবি বুঝেছিলেন প্রাচীন ভারতের উদার-উন্মুক্ত আধ্যাত্মিক আদর্শ বিশ্ববন্দিত যা মূলত ভারতকে পুণ্যতীর্থে পরিণত করেছিল এবং বহু সংস্কৃতি হৃদয়ের বাঁধনে আবদ্ধ হয়ে ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল যা রাষ্ট্রের সবথেকে বড়ো শক্তি। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন অনাদিকাল থেকে দেশে দেশে দিকে দিকে বিবিধ কর্মযজ্ঞে ভারতবাসীর যে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, তা তিলে তিলে তৈরি করেছিল সমৃদ্ধ কর্মসংস্কৃতি। এই কর্মময়তাই পরাধীন ভারতবাসীকে গতিময় করে তুলতে পারে। তাই যে পৃথিবীর স্বপ্ন তিনি দেখেছেন, বিশ্বপিতার আশীর্বাদে যে স্বদেশ তিনি নির্মাণ করতে চেয়েছেন, তা কর্মের মধ্য দিয়ে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাক এটাই তাঁর কামনা।

এ ছাড়াও পরাধীন ভারতবর্ষ এবং সমকালীন বিশ্বপরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রচিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল নাগরিকের বাকস্বাধীনতার অধিকার। সকল প্রকার মানবাধিকারের কথা মনে রেখেই পৃথিবীর বৃহত্তর কর্মযজ্ঞে ভারতবাসীর অংশগ্রহণ এবং সাফল্যলাভের স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। তাই প্রশ্নোদ্ভূত পঙ্ক্তিগুলিতে ভারতবর্ষের গৌরবান্বিত কর্মসংস্কৃতি এবং উদার হৃদয়ের কথা স্মরণ করে নতুন ভারতবর্ষকে তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

 

৬) ‘প্রার্থনা’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। ৫

ভূমিকাঃ

সাহিত্যের একটি প্রধান অঙ্গ হল নামকরণ। প্রসঙ্গত বলা যায় যে, নামকরণের মাধ্যমেই রচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে আগাম ধারণা করা যায়। নামকরণ বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে। যেমন-বিষয়কেন্দ্রিক, চরিত্রপ্রধান, ব্যঞ্জনধর্মী ইত্যাদি।

উৎসঃ

বিশ্বকবি ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ রচিত ‘নৈবেদ্য’ কাব্যের  অন্তর্গত ৭২ নং কবিতা হল ‘প্রার্থনা’।

নামকরণের সার্থকতা বিচারঃ

‘প্রার্থনা’ শব্দের মাধ্যমে কারও কাছে বিনম্র চিত্তে কিছু চাওয়া বা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা। এখানে ভগবানের কাছে কিছু চাওয়াকে বোঝানো হয়েছে। প্রাচীন ভারতের আদর্শে শ্রদ্ধাশীল কবি উপলব্ধি করেছেন বর্তমান ভারতীয়দের আত্মিক অবনতি ঘটেছে অনেকখানি। নানা দুর্বলতায় আচ্ছন্ন আজকের ভারতীয় মনন। দেশবাসীর দুর্দশা উপলব্ধি করে তাদের হৃদয়ে প্রকৃত জীবনসত্যকে উন্মোচিত করার প্রার্থনা করেছেন কবি পরমেশ্বরের কাছে। কবিতাটি হয়ে উঠেছে ভগবানের কাছে ভক্তিবিনম্র কবিচিত্তের আন্তরিক ‘প্রার্থনা’। পরমেশ্বরের কাছে কবি সেই ভারতের প্রার্থনা করেছেন-যেখানে ভারতীয়রা হবেন মানসিকতায় ভয়শূন্য, উন্নত শির। তাঁরা হবেন মুক্ত জ্ঞানের অধিকারী; গৃহের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকবে না তাদের জ্ঞানচর্চা। ভারতীয়রা ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জ্ঞানার্জনের আকাঙ্ক্ষায়। ক্ষুদ্র আচারের গন্ডি থাকবে না তাদের মধ্যে। কবিগুরু অনুভব করেন পরমেশ্বরই সকল কর্ম, চিন্তা ও আনন্দের হোতা। তাই তাঁর কাছেই কবি প্রার্থনা করেছেন পূর্বোক্ত আকাঙ্ক্ষাগুলির সফল রূপায়ণের। পরমেশ্বর যেন কঠিন আঘাতের মাধ্যমে ভারতীয়দের চৈতন্যের জগৎকে জাগ্রত করে তোলেন, যাতে ভারতীয়রা পুনরায় প্রাচীন গৌরব ফিরে পায়, ভারতবর্ষ যেন আবার নতুন প্রাণবন্যায় ভাসতে পারে-এমন প্রার্থনাই কবিগুরু পরমেশ্বরের কাছে করেছেন।

এভাবেই আলোচ্যমান কবিতায় পরমেশ্বরের প্রতি কবিহৃদয়ের বিনম্র প্রার্থনা প্রকাশিত হয়েছে। তাই সামগ্রিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে কবিতাটির নামকরণ ‘প্রার্থনা’ ব্যঞ্জনাময় ও সার্থক হয়েছে বলা যেতে পারে।

 

 

৭) “যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি বিচারের স্রোতঃপথ ফেলে নাই গ্রাসি, পৌরুষেরে করে নি শতধা;”- ‘যেথা’ বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন? কথাগুলি কবি কবিতায় কোন্ তাৎপর্যে ব্যবহার করেছেন?

উৎসঃ

বিশ্বকবি ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ রচিত ‘নৈবেদ্য’ কাব্যের  অন্তর্গত ৭২ নং কবিতা হল ‘প্রার্থনা’।

যেথা-র অর্থঃ

প্রশ্নোদ্ভূত পঙ্ক্তিগুলিতে ‘যেথা’ বলতে কবির কল্পিত তথা আকাঙ্ক্ষিত স্বদেশের কথা বোঝানো হয়েছে। বিশ্ববিধাতার কাছে যে সমুন্নত ভারতবর্ষের প্রার্থনা করেছেন কবি, ‘যেথা’ শব্দটি সেই প্রার্থিত স্বদেশকেই। নির্দেশ করেছে।

তাৎপর্যঃ

রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন যুগ যুগ ধরে চলে আসা অল্ব কুসংস্কার আর আচারসর্বস্বতায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে আমাদের মনের জগৎ। তিনি চেয়েছিলেন আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থায় একজন নাগরিকের বিচার-বিবেচনা-মূল্যবোধ যেন আবহমান কালের অন্ধ সংস্কারের দাসত্ব না করে। তাই তিনি লিখেছেন –

“যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি বিচারের স্রোতঃপথ ফেলে নাই গ্রাসি,”-

রবীন্দ্রনাথ চেয়েছেন মুক্ত চিন্তাশক্তির দ্বারা পরিচালিত হোক মানুষ। তিনি আরও বলেন-‘পৌরুষেরে করে নি শতধা;’ অর্থাৎ তিনি চান রাষ্ট্রক্ষমতার স্পর্ধিত আস্ফালন যেন সাধারণের সাহস এবং সততাকে শত ভাগে বিভক্ত না করে। কবি জীবনদেবতার কাছে প্রার্থনা জানান আচারসর্বস্বতা যেন মরুভূমির বালুরাশির মতো উন্নত ভারতবর্ষের আকাঙ্ক্ষিত জীবন এবং সমাজের গতিকে রুদ্ধ করতে না পারে। কবি চান দেশবাসীর আত্মপ্রত্যয়, পূর্ণজ্ঞানের আলো, মানবিক বিচারবুদ্ধি, কর্মসাধনা যেন স্বদেশকে বিশ্বের দরবারে গৌরবময় প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। সুতরাং ‘প্রার্থনা’ কবিতার আলোচ্য পঙক্তিগুলিতে বিশ্বকবির মানবকল্যাণের ভাবনাই প্রকাশ পেয়েছে।

 

 

৮) “যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি…”- ‘তুচ্ছ আচার’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? এখানে তুচ্ছ আচারের সঙ্গে মরুবালুরাশির তুলনা করা হয়েছে কেন?

উৎসঃ

বিশ্বকবি ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ রচিত ‘নৈবেদ্য’ কাব্যের  অন্তর্গত ৭২ নং কবিতা হল ‘প্রার্থনা’।

‘তুচ্ছ আচার’ বলতে যা বোঝানো হয়েছেঃ

‘তুচ্ছ আচার’ আসলে আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়, মানুষকে সংকীর্ণতার বেড়াজালে আবদ্ধ করে হীনতায় পর্যবসিত করে। কাব্যাংশে যে-সমস্ত আচরণ বিজ্ঞানসম্মত নয়, যে সংস্কারগুলি আমাদের কর্মপথে বাধার সৃষ্টি করে, অন্ধ সংস্কার পরিপূর্ণ। সেই আচার-আচরণগুলিকেই ‘তুচ্ছ আচার’ বলেছেন কবি। মানুষ যুগ যুগ ধরে নানারূপ অধ সংস্কারে আবদ্ধ এবং সেগুলির দ্বারা পরিচালিত। সেই অবৈজ্ঞানিক জীবনযাত্রার নিয়ন্ত্রক শক্তিকেই এখানে ‘তুচ্ছ আচার’ বলা হয়েছে।

তুচ্ছ আচারের সঙ্গে মরুবালুরাশির তুলনাঃ

আলোচ্য কবিতায় কথিত তুচ্ছ আচারের সঙ্গে কবি মরুবালুরাশির তুলনা করেছেন। মরুভূমির বালুকারাশি শুষ্ক, নীরস। তার ভিতরে জলস্রোত প্রবাহিত হতে পারে না। জলীয় সরসতাকে সে নিমেষে গ্রাস করে ফ্যালে। সামাজিক মানুষের পক্ষে ‘তুচ্ছ আচার’ গুলোও যেন মরুভূমির বালুরাশির মতোই। বিচারের পথে, ন্যায়ের পথে, কল্যাণের পথে মানুষ যখন অগ্রসর হয়; তখন মানবজীবনের সেই মঙ্গলময় ধারাকে আটকে দেয় তুচ্ছ আচার ও অন্ধ সংস্কারগুলি।

সুতরাং আলোচ্য অংশে তুচ্ছ আচারের সঙ্গে বিশুষ্ক মরুবালুরাশির তুলনাটি যথার্থ হয়েছে। জীবনে যা কিছু অকল্যাণকর তাকে দূরে সরিয়ে মঙ্গল ও কল্যাণের পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন উপনিষদে আস্থাশীল কবি রবীন্দ্রনাথ। মানবতাবাদে বিশ্বাসী কবি তাই আস্থা রেখেছেন যে, মানুষ একদিন তুচ্ছ আচার পরিত্যাগ করে বৃহত্তর চেতনায় এমন এক স্বদেশ গঠন করবে যেখানে অন্ধ কুসংস্কারের কোনো স্থান থাকবে না। মানুষের হৃদয় হবে মুক্ত।

 

 

৯) “… নিত্য যেথা/তুমি সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা-” এখানে ‘তুমি’ বলে কবি কাকে সম্বোধন করেছেন? তাঁকে ‘সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা’ বলে কবি মনে করেছেন কেন?

উৎসঃ

বিশ্বকবি ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ রচিত ‘নৈবেদ্য’ কাব্যের  অন্তর্গত ৭২ নং কবিতা হল ‘প্রার্থনা’।

‘তুমি’-র পরিচয়ঃ

প্রশ্নোদ্ভূত চরণে রবীন্দ্রনাথ ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করেছেন তাঁর আরাধ্য ঈশ্বর তথা জীবনদেবতা অর্থাৎ বিশ্ববিধাতাকে। আলোচ্য কবিতায় যাঁর কাছে তিনি উন্নত, স্বনির্ভর স্বদেশের প্রার্থনা করেছেন।

আনন্দের নেতা’ বলার কারণঃ

উপনিষদের মন্ত্রে দীক্ষিত, মানবকল্যাণকামী রবীন্দ্রনাথ পরাধীন ভারতবর্ষের মানুষের সবরকমের অধঃপতন প্রত্যক্ষ করে পীড়িত হয়েছিলেন। বুঝেছিলেন স্বদেশবাসীর এই অধঃপতনের মূলে রয়েছে মনুষ্যত্বের আদর্শ থেকে ভ্রষ্ট হওয়া এবং উদার, সংস্কারমুক্ত মানবধর্মকে গ্রহণ না করা। গভীর দুঃখবোধ থেকে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বপিতার কাছে স্বদেশবাসীকে উদ্ধারের জন্য প্রার্থনা করেছেন। কেননা রবীন্দ্রনাথ জানতেন আত্মবিস্মৃত আত্মবিশ্বাসহীন ভারতবাসীর সুপ্ত চেতনার জাগরণ ঘটাতে পারেন একমাত্র বিশ্বস্রষ্টা যাঁকে তিনি সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের অধিনায়ক বলে উপলব্ধি করেছেন। বিশ্বজগৎ এবং মানবজীবনের চালিকাশক্তি অপার রহস্যময় সেই জগৎস্রষ্টাকেই তিনি জীবনদেবতারূপে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি অনুভব করেছিলেন একমাত্র তিনিই পারেন আপন সৃষ্টির হারিয়ে যাওয়া গৌরব ফিরিয়ে দিতে। মঙ্গলময় ঈশ্বর জগতের আনন্দের মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করেন। ভারতবর্ষের অন্ধকার অধ্যায়ে তাই কবি অসীম আলোর উৎস, আনন্দের আধার বিশ্বপিতার আশীর্বাদকে অনিবার্য মনে করেছেন। সমস্ত অন্ধ সংস্কারের মূলে জগৎপিতার নিষ্ঠুর আঘাত কবির ভারতবর্ষকে নতুনরূপে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। নিজের জীবনদেবতার হাত ধরেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছোতে পারবেন বিশ্বকবি। এই ছিল তাঁর পূর্ণ বিশ্বাস।

 

 

১০) “নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি, পিতঃ, / ভারতেবে সেই স্বর্গে করো জাগরিত।”- কবি কাকে ‘পিতঃ’ সম্বোধন করেছেন? তাঁর কাছে কবি কী প্রার্থনা করেছেন?

উৎসঃ

বিশ্বকবি ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ রচিত ‘নৈবেদ্য’ কাব্যের  অন্তর্গত ৭২ নং কবিতা হল ‘প্রার্থনা’।

যাকে পিতঃ সম্বোধন করা হয়েছেঃ

প্রশ্নোদ্ভূত চরণে রবীন্দ্রনাথ ‘পিতঃ’ বলে সম্বোধন করেছেন তাঁর জীবনদেবতা তথা বিশ্ববিধাতাকে- যাঁর আশীর্বাদে তিনি কাঙ্ক্ষিত স্বদেশ গঠনের প্রত্যাশা করেছেন।

পিতঃ-র কাছে কবির প্রার্থনাঃ

জগৎপিতার প্রতি বিশ্বকবির আত্মনিবেদনের পরিচয় পাওয়া যায়। উপনিষদের মন্ত্রে দীক্ষিত, সত্য-সুন্দর-মঙ্গলের পূজারী রবীন্দ্রনাথ পরাধীন ভারতবর্ষের সামগ্রিক অবক্ষয় প্রত্যক্ষ করে ব্যথিত হয়েছিলেন। তাই স্বদেশবাসীর শুভচেতনার উন্মেষের জন্য বিশ্বপিতার কাছে প্রার্থনা করেছেন কবি।

মানবাত্মার পূর্ণ বিকাশের জন্য কবি বারবার ফিরে তাকিয়েছেন প্রাচীন ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক আদর্শের দিকে যেখানে রয়েছে জ্ঞানের – গরিমা, কর্মের সাধনা, প্রেম-প্রীতি-ত্যাগ-ভক্তির মহৎ উদারতা। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আর পরাধীনতার অপমানে ভারতবর্ষের ঐতিহ্য সংকটের মুখে। কবি উপলব্ধি করেছেন দেশবাসী ক্রমে জ্ঞানবিমুখ, কর্মবিমুখ হয়ে পড়েছে। ভারতবর্ষের এই পরিস্থিতি কবিকে মর্মাহত করেছে। তিনি চেয়েছেন স্বদেশবাসী আবার উন্নত মস্তকে নির্ভয় হয়ে দাঁড়াক, জ্ঞানের গরিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠুক, যাবতীয় ক্ষুদ্রতা-খণ্ডতাকে দূরে সরিয়ে কর্মচঞ্চল জীবনে যোগদান করুক। সমস্ত অন্ধতা, আচারসর্বস্বতাকে পরিত্যাগ করে পূর্ণতা, মহত্ত্ব, পবিত্রতার আদর্শে দীক্ষিত হোক তাঁর সহনাগরিকরা। তিনি প্রার্থনা করেছেন, তাঁর প্রিয় জন্মভূমিকে যেন কাঙ্ক্ষিত সমুন্নতির শীর্ষে বিশ্ববিধাতা পৌঁছে দেন। আর বিশ্বপিতার নিষ্ঠুর আঘাতেই আত্মবিশ্বাসহীন আত্মবিস্মৃত পরাধীন ভারতবাসীর সংবিৎ ফেরানো এবং স্বমর্যাদায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারা সম্ভব এই বিশ্বাসেই কবির এরূপ প্রার্থনা।

 

 

১১) “ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিত।”- রবীন্দ্রনাথের স্বর্গচিন্তার স্বরূপটি নির্ণয় করো।

উৎসঃ

বিশ্বকবি ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ রচিত ‘নৈবেদ্য’ কাব্যের  অন্তর্গত ৭২ নং কবিতা হল ‘প্রার্থনা’।

স্বর্গের স্বরূপঃ

‘স্বর্গ’ বলতে রবীন্দ্রনাথের কাঙ্ক্ষিত স্বদেশভূমিকে বোঝানো হয়েছে। আলোচ্য কবিতায় বিশ্বপিতার চরণে আত্মনিবেদন করে মানবকল্যাণের স্বার্থে তিনি যে ভারতভূমি কল্পনা করেছেন, তাকেই স্বর্গের মর্যাদা দিতে চেয়েছেন কবি।

রবীন্দ্রনাথের স্বর্গ ভাবনাঃ

আমাদের প্রচলিত সংস্কারে স্বর্গ-মর্ত্যের ধারণাটি হল- যারা পুণ্যবান তারা মৃত্যুর পর স্বর্গে গমন করে আর যারা পূণ্যলাভে ব্যর্থ তারা নরকে যায়। তবে ‘প্রার্থনা’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ এই প্রচলিত ধারণা থেকে সরে এসেছেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে স্বর্গ হল কবির স্বদেশ- আমাদের ভারতবর্ষ।

এখানে রবীন্দ্রনাথ স্বদেশবাসীর দৃঢ়প্রত্যয়ী মনোভাব এবং সেই সূত্রে ভারতবর্ষের সার্বিক উন্নতিসাধন প্রত্যশা করেছেন। যাবতীয় বিচ্ছিন্নতাকে দূরে সরিয়ে, সমস্ত খণ্ডতাকে পরিহার করে পূর্ণতার মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন আমাদের রাষ্ট্রকে। সব ধরনের হীনতা, সংকীর্ণতা পরিত্যাগ করে বিশ্বপিতার কাছে এমন এক স্বপ্নের স্বদেশ প্রার্থনা করেছেন বিশ্বকবি, যেখানে প্রধান হয়ে উঠবে মনুষ্যত্ব। কবির প্রার্থনা বিশ্বপিতা তাঁর নির্দয় আঘাতে যেন প্রিয় জন্মভূমিকে পৌঁছে দেন কাঙ্ক্ষিত উন্নতির শীর্ষবিন্দুতে। তিনি বিশ্বাস করেন জগদীশ্বরের নিষ্ঠুর আঘাতে আত্মবিশ্বাসহীন, আত্মবিস্মৃত পরাধীন ভারতবাসীর সংবিৎ ফিরবে এবং নিজেকে বিশ্বদরবারে স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে সে। সুতরাং ‘স্বর্গ’ বলতে রবীন্দ্রনাথ সেই কাঙ্ক্ষিত স্বদেশভূমিকে বুঝিয়েছেন, যেখানে মানুষের স্বাধীন চেতনা দ্বারাই তার নিজের জীবন পরিচালিত হবে- রাষ্ট্রের নির্দেশে নয়। বলা বাহুল্য, কবির এই স্বপ্ন শুধুমাত্র ভারতবর্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, যে-কোনো রাষ্ট্র তথা কাঙ্ক্ষিত পৃথিবীর বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। অর্থাৎ কবি ভারতকে উন্নীত করতে চেয়েছেন সেই স্বর্গে- যে স্বর্গভূমি সংস্কার-বিদ্বেষহীন, যে ভূমিতে স্বদেশের হারানো গৌরব ফিরে পাওয়া যাবে, যেখানে মানুষে-মানুষে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। ঈশ্বরের কৃপামিশ্রিত আঘাতে স্বৰ্গৰূপে প্রতিষ্ঠিত হবে যে দেশ সেই দেশই ভারতবর্ষ, সমগ্র বিশ্বের কাছে কবির স্বদেশ উপমাস্বরূপ- তাই সে দেশ স্বর্গেরই নামান্তর।

 

 

১২) প্রার্থনা’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের স্বদেশচিন্তার পরিচয় দাও।

উৎসঃ

বিশ্বকবি ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ রচিত ‘নৈবেদ্য’ কাব্যের  অন্তর্গত ৭২ নং কবিতা হল ‘প্রার্থনা’। রবীন্দ্রনাথের স্বদেশপ্রেমের নির্দশন ‘প্রার্থনা’ কবিতার ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে। এই কবিতায় তাঁর স্বপ্নের ভারতবর্ষের ছবি এঁকেছেন কবি। সেই ভারতবর্ষই যে এক আদর্শ স্বদেশের প্রতিচ্ছবিরূপে ধরা দিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

সুমহান ভারতবর্ষের ছবিঃ

ভারতবর্ষ একদিন জগতের দরবারে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন হবে- এটাই কবির বিশ্বাস। কবি এই কবিতায় এমন এক অখন্ড ভারতবর্ষের ছবি এঁকেছেন যেখানে কোনো সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ থাকবে না। মানুষ ভয়শূন্য হৃদয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচবে। জ্ঞান যেখানে সংকীর্ণ কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকবে না, যেখানে খণ্ড ক্ষুদ্র ভৌগোলিক সীমা নয়; বিরাট পৃথিবীর এক গুরুত্বপূর্ণ অংশরূপে ভারতবর্ষ বিরাজমান হবে। সে দেশের মানুষ নিজের গৃহাঙ্গনে আবদ্ধ থাকবে না। কারণ ভারতবাসী যদি সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখে তাহলে তাদের হৃদয়েও সংকীর্ণতা দেখা দেবে, তাতে চিত্তের উৎকর্ষসাধন হবে না। বরং ভারতবাসী অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে যে আবেগময় কথাগুলি মুক্তকণ্ঠে উচ্চারণ করে সেখানে ছলনার কোনো স্থান থাকে না। আর স্বদেশবাসীর এই স্বতঃস্ফূর্ত কথা বা বাল্বাধীনতাকেই প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছেন কবি। কারণ কবির দৃষ্টিতে ভারতবর্ষের মতো মহান দেশ সমগ্র বিশ্বে আর একটিও নেই।

কর্মের বৃহত্তর যজ্ঞে ভারতবাসীঃ

মানুষ তার জীবনধারণের জন্য কর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়। পৃথিবীতে কর্মের কত না ধারা বহমান আর সেই কর্মধারার সঠিক রূপায়ণের মধ্য দিয়েই স্বপ্নের দেশের ভিত্তি রচিত হতে পারে বলে কবি মনে করেছেন। কর্মপ্রবাহের মধ্য দিয়েই সফলতা আসে, জীবনধারাকে চলমান রাখে এই কর্মধারা। ভারতবাসীও সারা পৃথিবীতে তার কর্মের কৃতিত্ব দ্বারা পরিচিত হবে এবং বিশ্বের কাছে স্বদেশের নাম উজ্জ্বল করবে- এটাই কবির স্বপ্ন।

কুসংস্কারমুক্ত মনঃ

মানুষের জীবনের নানা কুসংস্কার, তুচ্ছ আচারগুলি মরুভূমির শুকনো বালির মতোই- যা জীবনের গতিকে স্তব্ধ করে দেয়। এই তুচ্ছ আচারের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হলে ভারতবাসী স্বর্গের ন্যায় স্বদেশভূমি গঠন করতে পারবে যেখানে ভারতবাসী শৌর্য, বীর্য, পরাক্রমের দ্বারা একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বিশ্ববাসীতে পরিণত হবে- এমনটাই কবির আশা জীবনদেবতার আশীর্বাদপ্রাপ্ত স্বদেশ: আমাদের সকল কাজকর্ম এক অদৃশ্য শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। সেই শক্তিকেই কবি ‘জগৎপিতা’ বলে সম্বোধন করেছেন। তিনি যেমন সর্ব কর্ম, চিন্তা, আনন্দের নেতা আবার তিনিই দেশের মঙ্গলের জন্য মানুষের সুপ্ত চেতনার মূলে নিষ্ঠুর আঘাত করতেও দ্বিধাবোধ করেন না। তাঁর নির্দয় আঘাতেই চূর্ণ হয় সমস্ত অন সংস্কারের শৃঙ্খল। তাই তাঁর আশীর্বাদকে পাথেয় করেই সমস্ত চিন্তাশক্তি, বোধবুদ্ধির শুভ জাগরণ ঘটিয়ে ভারতবর্ষকে এক স্বর্গীয় মহিমায় উন্নীত করতে চেয়েছেন কবি। সমগ্র কবিতাজুড়ে এভাবেই বিশ্বপিতার কাছে ধ্বনিত হয়েছে কবির প্রার্থনার বিশ্বজনীন সুর। অশুভ, কলুষিত পুরাতনকে বিশ্বপিতার আশীর্বাদী আঘাতে ধ্বংস করে নতুন ‘স্বর্গরাজ্য’ তথা স্বদেশ গঠনের আকাঙ্ক্ষাই স্বদেশপ্রেমী রবীন্দ্রনাথের একমাত্র প্রার্থনা।

পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির সকল বিষয়ের নোট দেখতে নিম্নের ছবিতে ক্লিক/টাচ করতে হবে

প্রার্থনা কবিতার প্রশ্নের উত্তর

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top