হারুন সালেমের মাসি গল্পের প্রশ্ন উত্তর

harun-salemer-masi-question-answers

হারুন সালেমের মাসি গল্পের প্রশ্ন উত্তর (দ্বাদশ শ্রেণির চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা) 

দ্বাদশ শ্রেণির উচ্চমাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার প্রদান করতে চলা শিক্ষার্থীদের জন্য FREENOTE.IN ওয়েবসাইটের পক্ষ থেকে হারুন সালেমের মাসি গল্পের প্রশ্ন উত্তর (দ্বাদশ শ্রেণির চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা) প্রদান করা হলো। শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই প্রশ্নের উত্তরগুলির সহায়তা লাভ করতে পারবে।

হারুন সালেমের মাসি গল্পের প্রশ্ন উত্তর (দ্বাদশ শ্রেণির চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা) :

 

১) “হারার কথা শুনে গৌরবি অবাক হয়ে গেল।”- হারার কোন্ কথা শুনে গৌরবি অবাক হয়ে গেল? অবাক হওয়ার কারণ কী?

উৎসঃ

বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা লেখিকা ‘মহাশ্বেতা দেবী’ রচিত ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্প থেকে প্রশ্নোক্ত তাৎপর্যপূর্ণ অংশটি চয়ন করা হয়েছে।

হারার যে কথা শুনে গৌরবী অবাক হয়েছেঃ

কথক গল্পের অন্যতম চরিত্র হারুন সালেম তথা হারাকে উদ্দেশ করেছেন। জিভের আড়ষ্টতার কারণে সে স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলতে পারে না। অঘ্রানের এক সকালে সে গৌরবির উঠোনে এসে বলল “মা ললে না মাসি! ডেকে ডেকে দেখলাম মা রা দেয় না।” অর্থাৎ তার মা নড়াচড়া করছে না, অনেক ডাকাডাকিতেও সাড়া দিচ্ছে না- হারার এই কথা শুনে গৌরবি অবাক হয়ে গিয়েছিল।

গৌরবীর অবাক হওয়ার কারণঃ

হারার মা আয়েছা বিবির সঙ্গে তার অনেক দিনের বন্ধুত্বের সম্পর্ক। দুজনেই দীনদুঃখী, অসহায়, বিধবা প্রতিবেশী। সহমর্মী এই দুই নারী জীবিকার উপকরণ সংগ্রহে একসঙ্গে বের হয়। খালপাড়ে-বিলের ধারে শাকপাতা, গুগলি ইত্যাদি সংগ্রহ করে যশিদের মাধ্যমে বিক্রি করে। দুজনে আলাদা ধর্মের মানুষ হলেও দুঃখ-দারিদ্র্য তাদের এক করেছে। পরস্পর সুখ-দুঃখের গল্প করে, একে অপরের মাথায় উকুন বেছে দিব্যি দিন কেটে যায় দুজনের। জীবনসংগ্রামের সেই একমাত্র সহায়ক সঙ্গীর হঠাৎ এমন অবস্থা হতে পারে গৌরবি তা কখনও ভাবতে পারেনি। যদিও গৌরবি জানত যে প্রত্যেক রাতে হারার মায়ের জ্বর আসে। কিন্তু সাতসকালে হারার মা ঘুম ভেঙে ওঠেনি, এমনকি সাড়াশব্দও করেনি-অকস্মাৎ এমন কথা হারার মুখে শুনে গৌরবি অবাক হয়ে যায়।

 

২) হারুন সালেমের মাসি গল্পের গৌরবি চরিত্রটি আলোচনা করো।

উৎসঃ

বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা লেখিকা ‘মহাশ্বেতা দেবী’ রচিত ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পের প্রধান চরিত্র হল গৌরবী।

গৌরবী চরিত্রের আলোচনাঃ

গৌরবীর বিবিধ চরিত্র বৈশিষ্ট্যগুলি ক্রমান্বয়ে আলোচিত হল –

বন্ধুত্বসুলভ মানসিকতাঃ

জন্ম থেকে গৌরবির একটা পায়ে খুঁতের কারণে জীবিকা অর্জনে সে অক্ষম। তাই দীনদুঃখী অসহায় বিধবা গৌরবি তার প্রতিবেশী হারার মা আয়েছা বিবির দেখানো উপার্জনের পথেই এগিয়েছে। আয়েছা বিবিকে রমজান মাস পালন করতে দেখে গৌরবি জানতে পেরেছে যে তাদের ধর্ম আলাদা; তবুও ধর্মপরিচয় তাদের বন্ধুত্বে ছেদ ফেলেনি। কাজের অবসরে হারার মা গৌরবির উঠোনে বসে গৌরবির মাথার উকুন বেছেছে, আবার দুজনে একই সঙ্গে হাটুরেদের বাজার ফেরত ফেলে যাওয়া বাঁধাকপির বুড়ো পাতা, থেতলে যাওয়া বিলিতি বেগুন কুড়িয়েছে।

উদার ও সংস্কারমুক্ত মানসিকতাঃ

ছেলে নিবারণ গৌরবিকে ভাত দিতে অস্বীকার করলেও ছেলের সঙ্গে ঝগড়া করে ভাত আদায় করতে যায়নি সে। বাস্তবকে স্বীকার করে নিয়ে সেই অনুযায়ীই নিজের জীবনকে পরিচালিত করেছে গৌরবি। আয়েছা বিবি আর হারাকে তার আপনজন বলেই মনে হয়েছে। জীবনের সারবস্তু সে বুঝেছে – যে সব গরিবের স্বর্গ আসলে এক। গৌরবির পেটে খিদের আগুন জ্বললেও হৃদয়ে জ্বলে সহানুভূতির প্রদীপ।

মানসিক দৃঢ়তাঃ

যশির কাছ থেকে হারার ব্যাপারে পরামর্শ নিলেও শহরের ফুটপাথে হারাকে মরতে পাঠায়নি গৌরবি। সাত বছরের অনাথ ছেলেটিকে অজানা অচেনা পথে মরতে পাঠানোর মতো অমানবিক নয় গৌরবি। বরং হারাকে শহরে ছেড়ে এলে নিবারণের বাড়িতে আশ্রয় পাওয়ার যে সুবর্ণ সুযোগ গৌরবি পেতে পারত সেটিও অবলীলায় ত্যাগ করেছে সে। মাতৃহারা অনাথ হারার বিষয়ে সিদ্ধান্তগ্রহণের বেলায় কেবল নিজের মনের কথা নিজের হৃদয়ের ডাকই শুনেছে গৌরবি।

মানবিক সিদ্ধান্তঃ

শুধুমাত্র সাত বছরের অনাথ হারাকে বাঁচানোর তাগিদে গৌরবি রাতের অন্ধকারে তাকে নিয়েই শহরের উদ্দেশে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে পা বাড়ায়। গৌরবি শহরের ব্যস্ততম রাজপথে ভিক্ষে করে হারাকে বাঁচাবে, যেখানে কেউ তাদের জাতধর্ম জিজ্ঞেস করবে না। এভাবেই মানবিকতার পবিত্র সুতোর বন্ধনে হারার সঙ্গে নিজেকে বেঁধে নেয় গৌরবি।

মা থেকে মাসিঃ

গৌরবি জাতধর্ম ত্যাগ করে, পিছুটান ভুলে মনপ্রাণ দিয়ে কেবলই ‘হারুন সালেমের মাসি’ হয়ে উঠতে চেয়েছে। গৌরবি আসলে বিধর্মী এক মাতৃহারা বালকের মায়ের দায়িত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছে। অধসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজকে সমুচিত শিক্ষা দিয়ে গৌরবি সব সামাজিক রীতিনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এবং প্রমাণ করেছে মায়ের কোনো জাত হয় না। নিবারণের মা গৌরবির এই হারুন সালেমের মাসি হয়ে ওঠার যাত্রা আসলে তার নিজের আত্মপরিচয় অর্জনের যাত্রা, তার স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার যাত্রা।

এভাবেই গৌরবী চরিত্রটি সকল পাঠকের প্রিয় চরিত্র হয়ে উঠেছে।

 

৩) ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্প অবলম্বনে হারা চরিত্রটির পরিচয় দাও।

উৎসঃ

বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা লেখিকা ‘মহাশ্বেতা দেবী’ রচিত ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পের অন্যতম সহায়ক চরিত্র হল হারা।

হারা চরিত্রের পরিচয়ঃ

হারা চরিত্রের বিবিধ চরিত্র বৈশিষ্ট্যগুলি ক্রমান্বয়ে আলোচিত হল –

বুদ্ধিমান ও সংযতঃ

অপুষ্টিতে ভোগা হারা নির্বোধ নয়। তাই মাকে কোনোরকম নড়াচড়া করতে না দেখে পরিস্থিতি বুঝে সে মাসি গৌরবিকে আড়ষ্ট উচ্চারণে বলেছে – “মা ললে না মাসি!” সদ্য মাতৃহারা হারা শোকে বিলাপ না করে মাসির কথামতো কাজ করেছে। বয়স অল্প হলেও জীবন অভিজ্ঞতায় বিজ্ঞ হারা মায়ের মৃত্যুর পর যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে মাসির কাছে এসে উঠেছে।

অনুগতঃ

মায়ের শিখিয়ে যাওয়া “মাসির পা ধরে পড়ে থাকিস”- এই শেষ কথাগুলি হারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। গৌরবির সব নির্দেশ মান্য করতে দেখা গিয়েছে হারাকে। গৌরবির নির্দেশে মায়ের কবরে মাটি দেওয়া, দূরসম্পর্কের কাকার কাছে আশ্রয় নিতে যাওয়া এমনকি গৌরবির ভর্ৎসনা শুনে নিজের বাড়িতে পালিয়ে গিয়েও পুনরায় মাসির কাছেই ফিরেছে সে। মাসির হাত ধরে নিরাপদে অচেনা শহরের পথে নির্দ্বিধায় পাড়ি দিয়েছে হারা। গৌরবির প্রতি তার আনুগত্যের প্রমাণ এখানেই পাওয়া যায়।

বাস্তববোধসম্পন্নঃ

হারার মধ্যে ছিল মানুষ চেনার ক্ষমতা। খিদে সহ্য করতে করতেই সে একেবারে বিজ্ঞ হয়ে উঠেছিল। বাবার মৃত্যুর সময় সে নিজের সমাজের লোকের দুর্ব্যবহার দেখেছে; মা মরতেই কাকার স্বার্থপরতা উপলব্ধি করেছে। তাই ছোট্ট হারা নিজের সমাজের কাছে আশ্রয় খুঁজতে যায়নি। গৌরবি মাসির কাছে থাকলে সে প্রাণে বাঁচবে – এই বাস্তব শিক্ষা তার মধ্যে ছিল।

মাসির প্রতি দায়িত্ববানঃ

খোঁড়া মাসিকে সাহায্য করার আপ্রাণ প্রচেষ্টা করেছিল হারা। ঘর থেকে সে মেটে আলু এনে দিয়েছে মাসিকে। থানকুনি শাক তুলেছে মাসির সঙ্গে, দোকানে ফাইফরমাস খেটে মাসির ঘরের কেরোসিন তেল জোগাড় করেছে। মাসির সঙ্গে মিয়োনো চালভাজা চিবিয়েছে।

মায়ের প্রতি অনুভূতিপ্রবণঃ

মাসির তাড়া খেয়ে একলা হারা নিজের ঘরের মেঝেতে এসে শুয়েছে; ঘুমের ঘোরে মাকে দেখেছে। মনে হয়েছে, এখনই মা এসে তার জন্য রাঁধতে বসবে – সব আবার আগের মতো হয়ে যাবে। মাতৃহীন হারার বুকের ভিতর মায়ের জন্য জমানো কান্না ঢেউ-এর মতো আছড়ে পড়েছে। অনাথ হারার এই বুকফাটা যন্ত্রণা ও মাতৃস্নেহবঞ্চিত এক শিশুর দুর্বলতা সত্যিই মনে দাগ কেটে যাওয়ার মতো।

মাসির প্রতি আস্থাবানঃ

খোঁড়া মাসি শহরের ব্যস্ততম রাজপথে কেমন করে তাল রাখবে একথা হারার মনে এসেছে। তবুও সহজসরল বিশ্বাসে আর মাসির প্রতি অগাধ ভরসা নিয়ে হারা গ্রাম ছেড়েছে। হারা মানবতার প্রতি গভীর আস্থায় মাসির হাত ধরে চেনা জীবন ছেড়ে অচেনা শহরের পথে পা বাড়িয়েছে।

 

৪) মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পে চিত্রিত নিবারণ চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।

উৎসঃ

বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা লেখিকা ‘মহাশ্বেতা দেবী’ রচিত ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পের অন্যতম সহায়ক চরিত্র হল নিবারণ।

নিবারণ চরিত্রের পরিচয়ঃ

হারা চরিত্রের বিবিধ চরিত্র বৈশিষ্ট্যগুলি ক্রমান্বয়ে আলোচিত হল –

নিবারণের ঈর্ষাঃ

একমাত্র বোন পুটির বিয়েতে ঘর তৈরির টাকা ভেঙে বাবা জামাইকে ঘড়ি-টর্চ-সাইকেল দেওয়ায় নিবারণের হিংসা ও রাগ হয়। নিবারণের ক্ষমতা থাকলেও সে মাকে তার কাছে রাখেনি। বোনের বরকে বিয়েতে দেওয়া সাইকেল-ঘড়ির প্রতি নিবারণের ঈর্ষা তাকে মায়ের প্রতিও বিমুখ করে তুলেছে।

মানসিক সংকীর্ণতাঃ

নিবারণের ঘরে দেড়শো টাকা দামের রেডিয়ো বাজে, অথচ একটা গাই-গোরু কিনে পালন করার জন্য গৌরবি একশো টাকা চাইলে সে দেয় না। সদ্য মাতৃহারা অনাথ বালক হারাকে নিয়ে গৌরবি নিবারণের কাছে আশ্রয় চাইতে গেলে মুসলমান বালককে আশ্রয় দেওয়ার আস্পর্ধা দেখে মাকে কটুকথা বলে নিবারণ।

সুবিধাবাদীঃ

নিবারণ আবার সুবিধাবাদীও বটে। সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর দেখাশোনার জন্যই নিবারণ মাকে রাখতে রাজি হয়। কিন্তু হারাকে ত্যাগ করার শর্ত দেয় গৌরবিকে।

প্রতিহিংসাপরায়ণতাঃ

গৌরবির বর্তমান আশ্রয়দাতা ভাইপো মুকুন্দকেও নিবারণ মায়ের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করতে চেয়েছে। মায়ের শেষ আশ্রয় ও অবলম্বনটুকু কেড়ে নিয়ে নিবারণ তার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে চেয়েছে। ছেলেবেলার রাগ পুষে রেখে প্রবল প্রতিহিংসায় অমানবিক এক কুপুত্র হয়ে উঠেছে গল্পের নিবারণ।

 

৫) ‘গৌরবি তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারে না।”- গৌরবির এই সমস্যার কারণ কী? হাঁটার সমস্যার কারণে সে কার উপর, কীভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল?

উৎসঃ

বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা লেখিকা ‘মহাশ্বেতা দেবী’ রচিত ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্প থেকে প্রশ্নোক্ত তাৎপর্যপূর্ণ অংশটি চয়ন করা হয়েছে।

সমস্যার কারণঃ

গল্পে বর্ণিত গৌরবি বিশেষভাবে সক্ষম এক দরিদ্র, অসহায় বিধবা। তার একটি পা জন্ম থেকেই ত্রুটিযুক্ত, গোড়ালি ও পাতা বাঁকা। পায়ের ‘আঙুলগুলো পেছনে বাঁকানো।’ এই কারণে সে তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারে না। পা টেনে টেনে কষ্ট করে হাঁটতে হয় গৌরবিকে।

গৌরবীর নির্ভরশীলতাঃ

হাঁটার সমস্যার কারণে গৌরবি জীবিকার প্রয়োজনে শহরে যেতে পারে না। একাকী অসহায় নারী আর এক দুঃখিনী প্রতিবেশী আয়েছা বিবির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আয়েছা বিবি ওরফে হারার মা গৌরবিকে জীবিকার উপায় বলে দেয়। দুজনে মিলে বিলের ধারে, খালপাড়ে থানকুনি পাতা, কচুশাক, যজ্ঞডুমুরের ডাল, দূর্বাঘাস, বেলপাতা তোলে। তারপর সেগুলি বেচতে দেয় যশিদের কাছে। যশিরা শহরে সেসব বেচে পয়সা দেয় ওদের- এতে তাদের দিন গুজরান হয়। শাকপাতা, গুগলি সংগ্রহ করতে হারার মা গৌরবিকে সাহায্য করে। এইভাবে গৌরবি জীবিকা বা আর্থিক দিক থেকে আয়েছার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। এমনকি দুই নারী ছিল পরস্পরের সুখদুঃখের সঙ্গী। ফলে মানসিকভাবেও গৌরবি, হারার মা-র উপর নির্ভরশীল ছিল।

 

৬) “ঈশ্বরের জিনিস তো!  শাকে-পাতায় দোষ নেই।” – শাকপাতাকে কেন ‘ঈশ্বরের জিনিস’ বলা হয়েছে? এসব জিনিস দোষমুক্ত কেন?

উৎসঃ

বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা লেখিকা ‘মহাশ্বেতা দেবী’ রচিত ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্প থেকে প্রশ্নোক্ত তাৎপর্যপূর্ণ অংশটি চয়ন করা হয়েছে।

শাকপাতাকে ঈশ্বরের জিনিস বলার কারণঃ

গৌরবির মনে হয়েছে শাকপাতা ঈশ্বরের জিনিস। কারণ এগুলি প্রকৃতির দান আর বিশ্বপ্রকৃতি তো ঈশ্বরেরই সৃষ্টি। গৌরবি দীনদুঃখী সাধারণ এক বিধবা নারী। তার গ্রাম্য সরলতায় ধর্মীয় সংস্কার ও ঈশ্বরবিশ্বাস থাকা স্বাভাবিক। সেই বিশ্বাস থেকে তার মনে হয়েছে খালপাড়ে বা বিলের ধারে আপনাআপনি গজিয়ে ওঠা থানকুনি পাতা, বেলপাতা, ঢেঁকিশাক, দূর্বাঘাস, যজ্ঞডুমুরের ডাল ইত্যাদি উদ্ভিদ ঈশ্বরের জিনিস। এমনকি জলাশয়ে যে গুগলি পাওয়া যায় সেও ঈশ্বরেরই দান।

দোষমুক্তির কারণঃ

এইসব শাকপাতা ও গুগলি যা গৌরবি ও আয়েছা বিবি সংগ্রহ করে এবং যেগুলি তাদের জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন- সেই ‘ঈশ্বরের জিনিস’ ধর্মীয় সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত। গৌরবির এক পা খোঁড়া বলে শাকপাতা তোলার কাজে সে আয়েছা বিবির উপর নির্ভরশীল। যেহেতু আয়েছা মুসলমান তাই তার হাত থেকে শাকপাতা নিতে হিন্দু গৌরবির বাধো বাধো ঠেকত কারণ দূর্বা, বেলপাতা পুজো ও শুভ কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে এসব জিনিস মানুষের চাষ করা নয়, এমনকি কারও ব্যক্তিগত জমিতেও জন্মায় না। তাই গৌরবি নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার ছলে মনে করত ঈশ্বরের জিনিস শাকপাতা বিধর্মীর স্পর্শদোষ থেকে মুক্ত।

 

৭) “সঙ্গে যা হারা। মাটি দে।”- বক্তা কে? প্রশ্নোদ্ভূত ঘটনার প্রেক্ষিত বর্ণনা করো।

উৎসঃ

বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা লেখিকা ‘মহাশ্বেতা দেবী’ রচিত ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্প থেকে প্রশ্নোক্ত তাৎপর্যপূর্ণ অংশটি চয়ন করা হয়েছে।

বক্তাঃ

উদ্ধৃত অংশটির বক্তা গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র গৌরবি।

ঘটনার প্রেক্ষিতঃ

অঘ্রানের এক সকালে গল্পের শিশু-চরিত্র হারা এসে গৌরবিকে জানায় তার মায়ের সাড়া না দেওয়ার কথা। তা শুনে হতচকিত হয়ে যায় গৌরবি। ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে সে হারাকে সঙ্গে নিয়ে তাদের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়। হারার বাবা সামান্য ঘরামি হওয়া সত্ত্বেও পালবাবুদের চেয়ে উঁচু করে ঘর তোলায় এমন বিলাসিতা মেনে নিতে পারেনি সমাজ। ঘটনাক্রমে কিছুদিনের মধ্যেই সাপের কামড়ে মৃত্যু হয় হারার বাবার। স্বামীর মৃত্যুতে কাতর হয়ে পড়ে আয়েছা বিবি। সাত বছরের ছোট্ট ছেলেটাকে নিয়েই তার দিন গুজরান হচ্ছিল। ইতিমধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়ে সে। রোজ রাতে জ্বর আসত হারার মায়ের আর সেই উঁচু করে বাঁধা ঘরেই একা শুয়ে কাঁদত সে। এভাবেই একদিন নিথর হয়ে যায় তার দেহ, হারা ডেকে ডেকে আর মায়ের সাড়া পায় না।

হারার মায়ের মৃত্যুতে গৌরবিও ভীষণভাবে আহত হয় কারণ গৌরবির নিঃসঙ্গ জীবনে একমাত্র সঙ্গী ছিল এই আয়েছা বিবি। হারার মায়েরও সাতকুলে কেউ ছিল না, কেবল এক দুঃসম্পর্কের কাকা ছিল হারার, সে মোট বয়, মাঝে মাঝে বাস-স্ট্যান্ডে থাকে। তার আসার অপেক্ষায় ব্যর্থ হয়ে অবশেষে বিকেলবেলায় রাজমিস্ত্রি পাড়ার কয়েকজন এসে হারার মাকে কবরস্থ করে। সেইসময় হারার ধর্মানুযায়ী, তার মাকে মাটি দেওয়া প্রসঙ্গে বক্তা অর্থাৎ গৌরবি উক্ত মন্তব্যটি করেছে।

 

৮) “এইসব সময়ে গৌরবির বড়ো কষ্ট হয়। ও রেললাইনের দিকে চেয়ে থাকে।” –  গৌরবির কষ্টের কারণ কী? সে বেললাইনের দিকে চেয়ে থাকে কেন?

উৎসঃ

বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা লেখিকা ‘মহাশ্বেতা দেবী’ রচিত ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্প থেকে প্রশ্নোক্ত তাৎপর্যপূর্ণ অংশটি চয়ন করা হয়েছে।

গৌরবীর কষ্টের কারণঃ

আলোচ্য গল্পের প্রধান চরিত্র গৌরবি চিরদুঃখী এক বিধবা নারী। প্রতিবেশী, বান্ধবী আয়েছা বিবির অর্থাৎ হারার মা-র মৃত্যুর পর পুত্র-পরিত্যক্তা নিঃসঙ্গ গৌরবি নিজের জীবনের অন্তিম পরিণতির কথা চিন্তা করে কষ্ট পায়। হারার মাকে তার নিজের চেয়ে ভাগ্যবতী বলে মনে হয়; কারণ আয়েছা বিবি নিজের ঘরে মৃত্যুবরণ করেছে এবং সে তার পুত্র হারার হাতের মাটি পেয়েছে। কিন্তু গৌরবির কোথায় মৃত্যু হবে, কে তার মুখাগ্নি করবে সে তা জানে না। তাই সে মনে মনে ভাবে – “আমি বা কোথায় মরব, কে মুখ শলা করবে কে জানে।”

ছেলে নিবারণ মাকে আশ্রয় দেয়নি, দেখাশোনাও করে না। তাই গৌরবি নিজের ঘরেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করতে পারবে কি না এবং ছেলের হাতের আগুন পাবে কি না সে বিষয়ে তার সংশয় আছে। তাই নিজের পরিণতির কথা চিন্তা করেই কষ্ট পেয়েছে গৌরবি।

রেললাইনের দিকে চেয়ে থাকার কারণঃ

পুত্রস্নেহে কাতর গৌরবি তার কষ্টের সময়ে রেললাইনের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাত্র কয়েকটা স্টেশন দূরে গৌরবির সমাজের লোকেরা জমি পেয়েছে। তার ছেলে নিবারণও সেখানে ঘর বানিয়ে বাস করছে। কিন্তু মাকে সে তার ঘরে থাকতে দেয়নি, নেয়নি ভরণ-পোষণের দায়িত্ব। এক পায়ের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে, অসম্ভব দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করতে হচ্ছে গৌরবিকে। স্বার্থপর, প্রতিহিংসাপরায়ণ নিবারণ তার নিজের বোনের বরকে বিয়েতে সাইকেল-ঘড়ি-টর্চ দেওয়ার রাগে মাকে আশ্রয় না দিয়ে প্রতিশোধ নিয়েছে। তাই মৃত্যুর পর আত্মজের হাতের আগুনটুকু পাওয়ার আশা ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কায়, কষ্টে গৌরবি উদাস নয়নে তাকিয়ে থাকে রেললাইনের দিকে-যে রেললাইন মাতৃহৃদয়কে নিয়ে যায় ছেলের কাছে।

পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির সকল বিষয়ের নোট দেখতে নিম্নের ছবিতে ক্লিক/টাচ করতে হবে

হলুদ পোড়া গল্পের প্রশ্ন উত্তর

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top